বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এই দেশ বারে বারে মুখ থুবড়ে পরেছে৷ সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগটি নেমে এসেছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট এর কালো রাত্রিতে,যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে এই দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়৷এর পরবর্তী ইতিহাস আমাদের সবারই জানা৷ মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে বাংলাদেশকে বিচ্যুত করে গণতন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সামরিক স্বৈর শাসকরা এই দেশ পরিচালনা করতে থাকে৷বাংলাদেশকে উন্নয়ন ও অগ্রগতির বিপরীতে উল্টো দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়৷ ১৯৯০ সালের গণঅভূ্যত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের ধারায় ফিরতে থাকে৷ এরপরও আমরা গণতন্ত্রকে হোঁচট খেতে দেখেছি,একবার ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারীর একদলীয় নির্বাচনের মধ্যদিয়ে এবং পরবর্তীতে ২০০৭-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অসাংবিধানিক ভাবে লম্বা সময় ধরে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার মাধ্যমে৷ বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্রের প্রতি আকাক্সখা এতটাই বেশী যে কোনো দূষকৃতিকারী গণতন্ত্রকে আবার চুরি করার সাহস করেনি৷
১৯৯০ সালের পর থেকে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার বদল হলেও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টার কমতি আমরা দেখিনি৷ ২০০১ সালের নির্বাচন তার প্রকৃষ্ট উদাহরন৷ দেশের সংখ্যালঘু সমপ্রদায়কে নির্বাচনে অংশগ্রহনে বাধা দেয়ার মাধ্যমে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জ্বলনত্ম উদাহরন আছে৷ এমনকি নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের উপর যে অত্যাচার হয়েছিল জাতির স্মৃতিতে তা আজও ভাষ্মর৷ অপরদিকে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পূর্নাঙ্গরুপে কবর দেয়ার সকল প্রচেষ্টা সম্পূর্ন হয় বিগত ২০০১ -০৬ সরকারের সময়ে৷
আমরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতায় সন্ত্রাসকে উদ্বুদ্ধ করার নির্লজ্জ নজীর দেখেছি৷ সন্ত্রাসবাদকে উস্কে দিয়ে দেশকে মৌলবাদ এবং জঙ্গীবাদের এক মহাচক্রে ফেলে দেয়া হয়৷ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রক্রিয়া হিসেবে বেছে নেয়া হয় হত্যাকান্ড এবং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দীদের সমূলে উপরে ফেলার কৌশল৷ এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে কিবরিয়া, আহসানুল্লাহ্ মাষ্টার সহ অসংখ্য রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটানো হয়৷
গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা দেখেছি৷ অপশক্তির গ্রেনেড হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান। বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল হত্যাযজ্ঞের এক চারনভূমি৷
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শুধু সন্ত্রাস নয়, দুর্নীতিরও এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়৷ বিদ্যুৎ খাতে যে দূর্নীতি হয়েছে ২০০১-২০০৬ সালে তা আজ সর্বজনবিদিত৷ বিদ্যুত্ এবং জ্বালানী খাতে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশ অনেক বছর পিছিয়ে গেছে৷ এমনকি ঢাকা শহরের যানজট নিরসনের প্রচেষ্টা হিসেবে কোন উদ্দ্যোগই আমরা দেখিনি৷ পুরো বাংলাদেশের মোট যানবাহনের ৬০ শতাংশ ঢাকা শহরে চলাচল করে৷ যানজট আমাদের নগর জীবনে একটি অন্যতম সমস্যা৷ এছাড়াও ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থা উন্নত না হলে দেশের অর্থনীতির ওপর এর প্রভাব পরে৷ সেই দৃষ্টিকোন থেকেই এই শহরের যানজট নিরসনে কিছু ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল, যার কিছুই হয়নি৷ আশার কথা হলো এতকিছুর পরেও বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে৷ আমাদের আর্থ-সামাজিক যে অবস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে সরকারের যে অব্যবস্থাপনা চলে এসেছে তাতে সমস্যার সহসাই সমাধান হয়ে যাবে তা আমি মনে করি না৷ তবে সমাধানের পথে, পরিবর্তনের পথে বাংলাদেশ একটু একটু করে এগুতে শুরু করেছে৷ এই এগিয়ে যাওয়ার স্বীকৃতি আমরা বিভিন্ন স্বীকৃত আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও পাচ্ছি৷
সম্প্রতি জাপান ব্যাংক অব ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (JBIC) ১৫তম শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগবান্ধব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে চিহ্নিত করেছে৷
ইন্টারন্যাশনাল ফাইনান্স কর্পোরেশন (IFC) Doing Business Report 2011 এ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৮৩ টি দেশের মধ্যে প্রথম ১০ এ অবস্থান করছে৷ বাংলাদেশ সরকারের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরীতে যে উদ্যোগগুলো নেয়া হয়েছে এই জরিপ তারই স্বীকৃতি৷
গার্টনার (Gartner) একটি বিশ্ব স্বীকৃত গবেষনা প্রতিষ্ঠান যা ICT উন্নয়নের গতি পর্যবেক্ষন করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে৷ গার্টনার এর Report এ বাংলাদেশকে ICT outsourcing এর জন্য বিশ্বের প্রথম ৩০টি দেশের মধ্যে রাখা হয়েছে৷
বাংলাদেশ বোর্ড অব ইনভেষ্টমেন্ট (BOI) এ যাবত্ কালের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ রেজিষ্ট্রেশন সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে৷
Moody’s এবং S & P এর মতে Country risk বিবেচনার দক্ষিন এশিয়াতে বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাকে পিছনে ফেলে ঠিক ভারতের পরেই৷ Moody’s এর সর্বশেষ মূল্যায়নে যেখানে অ্যামেরিকা এবং স্পেন এর মতো দেশগুলো পিছিয়ে পড়েছে এবং ভিয়েতনাম পিছিয়ে পরে বাংলাদেশের নিচে নেমে এসেছে, সেখানে বাংলাদেশ তার আগের জায়গা ধরে রেখেছে৷ Moody’s বলেছে যে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও যথেষ্ট স্থিতিশীল৷ অর্থনৈতিক উন্নয়নমূলক বিভিন্ন খাতে সরকারের সাহসী এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারনেই এই অর্জন সম্ভব হয়েছে৷ বিশ্ব ব্যাপী বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের স্বীকৃতি পাচ্ছে৷
যানজট নিরসনেও সরকার বেশকিছু কার্যকর উদ্যোগ হাতে নিয়েছে৷ আমরা গত দুবছরের মধ্যেই দেখেছি বিশ্বরোড-কুড়িল এবং যাত্রাবাড়ী এলাকার বিশাল উড়াল সেতু নির্মানের কাজ চলছে যা আমরা স্বচক্ষেই দেখতে পাই৷ এই দুটি প্রকল্পের কাজই ৪৫ শতাংশ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে এবং অতি দ্রুত বাকি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে৷ আমরা জানি, ইতিমধ্যেই অন্যান্য আধুনিক শহর গুলোর মতো ঢাকা শহরে উড়াল সড়ক নির্মানের কাজও শুরু হয়েছে৷ এই উড়াল সড়ক হযরত শাহ্জালাল বিমানবন্দর থেকে ২৬ কিলোমিটারের একটি উড়াল মহাসড়ক যা সায়দাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত৷ সরকার মেট্রোরেল প্রকল্প নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে যার বাস্তবায়ন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র৷
বিদ্যুত্ খাতে সরকার বিশেষ নজর দিয়ে ইতিমধ্যেই ১৩৩১ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রীড এ সংযোগ দিয়েছে৷ বিদ্যুত্ সমস্যার মূল জায়গাটি আমাদের বুঝতে হবে৷ একটি দেশে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ এর যোগান নিশ্চিত করতে হলে মোট চাহিদার তুলনায় যোগান ১৫ শতাংশ বেশী থাকতে হয়৷ কারন উত্পাদন ক্ষমতার ১৫ শতাংশ রক্ষনাবেক্ষন এর জন্য সবসময় বিদ্যুত্ উত্পাদন থেকে বিরত থাকে৷ অথচ এই সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন মোট চাহিদার তুলনায় বিদ্যুত্ উত্পাদন ক্ষমতা ২৫ শতাংশ কম ছিল৷ অর্থাত্ চাহিদা এবং যোগানের পার্থক্য ছিল ৪০ শতাংশ৷ এই পার্থক্য দুর করার জন্য সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ এক দুই বছরে এই পার্থক্য দুর করা সম্ভব নয়৷ তথাপিও সরকার যেভাবে স্বল্পমেয়াদী, মধ্যমেয়াদী এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহনের মাধ্যমে বিদ্যুত্ পরিস্থিতি সাহসের সাথে মোকাবেলা করেছে তা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য৷ সরকার তার স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুত্ উত্পাদনের প্রচেষ্টা নিয়েছে যার সবগুলো গ্যাসের পরিবর্তে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুত্ উত্পাদন করবে৷ গ্যাসের যোগান পর্যাপ্ত না থাকায় স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারকে এই প্রক্রিয়ায় যেতে হয়েছে৷ ফার্নেস অয়েল ব্যবহারের ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ বেড়ে যাবে যা সরকার ভর্তূকি প্রদানের মাধ্যমে ব্যবস্থা করবে৷ আমাদের মনে রাখতে হবে বিদ্যুত্ এর অনুপস্থিতি দেশের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকারক, কাজেই দাম দিয়ে হলেও জরুরী অবস্থা মোকাবেলায় ত্বরিত পদ্ধতি অবলম্বনের কোন বিকল্প ছিল না যা সরকার শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও দক্ষতার সাথে ব্যবস্থা নিয়েছে৷
অবকাঠামোগত উন্নয়নের বাইরেও সমাজে মূল্যবোধের উন্নয়নের নিমিত্তে যে যুগোপযোগী শিক্ষানীতি নেয়া হয়েছে তার সঠিক বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ অনেক দুর এগিয়ে যাবে৷ নারী নীতির পূর্নাঙ্গ বাস্তবায়ন নারী সমাজ তথা এই দেশের এগিয়ে যাওয়ার পথে কার্যকরী ভূমিকা রাখবে৷ যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে দীর্ঘদিন পর যা শেষ করতে না পারলে এই দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে না৷ সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা মূল্যবোধের উন্নয়নের জন্য জরুরী, যে পথে বাংলাদেশ এখন হাঁটছে৷ সংবিধান এ যে কলঙ্ক সন্নিবেশিত হয়েছিল সামরিক স্বৈর শাসকদের অগণতান্ত্রিক, হঠকারী আচরনের মধ্যে দিয়ে তাও আজ পরিচ্ছন্ন হতে চলেছে৷ আমাদের সংবিধান আজ অনেকখানি কলুষমুক্ত হওয়ার পথে৷
বাংলাদেশ আবার ঘুড়ে দাঁড়িয়েছে৷ ১৯৭৫ এর ১৫ই আগস্ট পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে যে কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল তা আজ অন্তিম শয্যায়৷ পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে আবারও৷ বাংলাদেশ তার আপন শক্তিতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারন করে এক নতুন সম্ভাবনার দরজা উন্মুক্ত করেছে৷ আমরা জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদকে কড়া গলায় ’না’ বলেছি এবং আধুনিক বাংলাদেশ গড়ার সংকল্প প্রতিফলিত হচ্ছে চারিদিকে৷ বঙ্গবন্ধুর ভাষায় বলতে চাই,”আমাদের কেউ দাবায় রাখতে পারবা না”৷ এদেশের শক্তি এবং সম্ভাবনা অপরিসীম এই শক্তি এবং সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ তার আপন মহিমায় আবির্ভূত হবেই৷ আমাদের জয় নিশ্চিত৷
মোহাম্মদ এ আরাফাত
শিক্ষক,ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি,বাংলাদেশ৷




Posted on May 30, 2011
Thank you very much to Mr. Arafat to show us the vivid comparison of the two regimes. Even though I do not see Mr. Arafat writing much but whenever he writes he writes some very solid. I am a big admirer of Mr. Arafat.
Posted on May 30, 2011
This write up is an eye opener. Many thanks goes to Mr. Arafat. It looks like we have found out a leader who can play some flute of hope for this nation. We all look forward to you Mr. Arafat. We are all with you.
Posted on May 31, 2011
ধন্যবাদ,অাপনােক
muhammad shahidullah
lecturer
islamic history & culture
jagannath university
dhaka 1100
Posted on Jul 12, 2011
It was a wonderful write up. We would love see more write up from you Mr. Arafat. Please teach the lead the nation toward lights.. Joy Bangla