৪১ বছর ধরে কাঁদছেন বীরঙ্গনা রিজিয়া

Print This Post Email This Post

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী রয়েড়া গ্রামের ঝোপের মধ্যে ডোবার পাশে জীর্নশীর্ন স্যাতস্যাতে ছোট একটি একচালা ছাপড়া ঘরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বীরঙ্গনা রিজিয়া খাতুনের বসবাস৷ পরনে সাদা শাড়ি অসংখ্য তালি দেওয়া আর ঘরের বারান্দায় এক পাশে রান্না ঘর৷ সংসারে দুই মেয়ে,এখন মুক্তিযোদ্ধা স্বামীর ভাতার টাকা ছাড়া বীরাঙ্গনা রিজিয়ার কপালে আজও আছে পাক সেনাদের এঁকে দেওয়া হিংস্র থাবার চিহ্ন৷ আজ তার মাথার তেলও দেওয়ার ভাগ্যে জোটেনি বলে কেঁদে উঠলেন৷

স্বাধীনতার ৪১ বছর পরও ৬২ বছরের বৃদ্ধা বীরঙ্গনা রিজিয়া বেগম আজও ভূলতে পারেনি সেদিনের পাক বাহিনীর কাম্পে নরক যন্ত্রনার কথা সে কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন৷ সেই থেকে তাঁর কষ্টের জীবন শুরু,আজও দুঃখ কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন এই বীরঙ্গনা ১৯৭১ সালের মে মাস৷ পাকসেনারা বিভিন্ন এলাকা দখল করে নিয়ে গ্রামে গ্রামে চালাছে অত্যচার,হত্যা ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য৷

রিজিয়া বেগমের বাড়ি ছিল রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার কসবামাঝাইল গ্রামে৷ পিতা নজু মন্ডলের ৩ ছেলে ও ৪ মেয়ের মধ্যে ১৮ বছরের রিজিয়া বেগম ছিল দ্বিতীয়৷ গ্রামে গ্রামে তখন পাক হানাদার বাহিনী আর রাজাকারের অত্যচারের ভয়ে মানুষ গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে৷ তাই রিজিয়ার বাবা  বাড়িতে সুন্দরী যুবতী মেয়ে রাখা নিরাপদ মনে করেননি৷

শৈলকুপা মাইলমারি গ্রামের খালু রফিক ছিলেন এলকার প্রভাবশালী তাই খালু খবর পাঠান রিজিয়াকে তাঁর বাড়ি পাঠিয়ে দিতে৷মে মাসে রিজিয়া বড়ো ভাই আজমত আলী ও ছোটবোন মোমেনাকে সাথে নিয়ে মাইলমারি গ্রামের উদ্দেশ্য রওয়ানা দেন৷ পথের মাঝে রানীনগর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার হাজারী মন্ডলের বাড়ির নিকট পৌছাতেই সন্ধা হয়ে যায়৷ এই লম্পট রাজাকার হাজারী মন্ডল তাদের রাতে নিরাপদে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে তাঁর বাড়ি নিয়ে যায়৷
রিজিয়া জানান: দিনটি ছিলো সেমাবার৷ পরদিন সকালে হাজারী পাক বাহিনীর ক্যাম্পে খবর দেয়৷রিজিয়ার হাতে ছিলো একটি দামী রিকো ঘড়ি৷ পাক সেনারা ও রাজাকাররা ঘড়িটি দেখে বলে এটি গোপন খবর পাঠানো যন্ত্র৷ তাঁর নিকট থেকে ঘড়িটি ছিনিয়ে নেয়৷ এর পর পাক সেনাদের দৃষ্টি পড়ে সুন্দরী রিজিয়ার উপর এবং জানায় তাদের সাথে শৈলকুপা সেনা ক্যাম্পে না, গেলে তাঁর ভাই বোনকে তাঁর সামনে হত্যা করা হবে৷ ভাই বোনের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন জলাঞ্জলি দেন৷ তাকে আনা হয় শৈলকুপার ওয়াপদা অফিসের বাংলোতে৷ তারপর শুরু হয় নির্মম নির্যাতন৷

রিজিয়া জানান সেখানে আরো ১৫/১৬ জন নারীকে বন্দী অবস্থায় তিনি দেখেছেন তারা ছিলও অসম্ভব সুন্দরী৷ কিন্তু কারোর সঙ্গে কোন কথা বলতে দিত না৷ এর পরেও বুটদিয়ে লাথি মারতো,অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করতো৷ শৈলকুপা যেদিন শক্রমুক্ত হলো তার কয়েকদিন আগে তাদের ওয়াপদাতে নিয়ে রাখা হয়েছিল৷ দেশ স্বাধীনের পর ৮ নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা একটি দল শৈলকুপা আইবি থেকে যখন উদ্ধার করেন তখন সবাই ছিল বিবস্ত্র অবস্থায়৷ অন্য নারীরা বস্ত্র পেয়ে যে যার মত নিজ বাড়ী ও এলাকাতে ফিরে যান৷ কিন্তু জীবন থেকে পালিয়ে যাননি রিজিয়া বেগম৷
রিজিয়া জানান:
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার দবির উদ্দিন জোয়াদ্দার ও রহমত আলী মন্টু তাকে উদ্ধার করে রয়েড়া গ্রামের ওয়াজেদ আলির বাড়িতে আশ্রয় দেন৷ দবির উদ্দিন বলেন এই নারীকে কে বিয়ে করতে চান ? তখন মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম তাকে বিয়ে করার জন্য প্রস্তাব দেন৷ তখন রিজিয়াকে কসবামাঝাইল গ্রামে পিতার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়৷ সিরাজুল ইসলামে তাঁকে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যদা দিয়ে ঘরে তুলে নেন৷ কিন্তু পরিবাবেরর অন্য সদস্যরা বিষয়টি স্বাভিাবিক ভাবে মেনে নিতে পারেননি৷ এর পার অনেক দেরীতে তাদের ঘরে দুটি কন্যা সত্মানের জন্ম হলে পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক হয়৷ সংসারে শ্বশুর শ্বাশুড়ি, দেবর ননদ সহ অন্যরা তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করতো৷ তবে তাঁর স্বামী কখনও তাঁকে অবহেলা কোনো অসম্মান করেনি৷ কিন্তু তিনি এখনও সমাজে মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি৷

“স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আমি বীরঙ্গনা” এ কথা ভেবে লাভ কি ? জীবন আর চলছেনা রিজিয়া খাতুনের সংসারে অভাবের শেষ নেই৷ স্বামীর মৃতুর পর তাঁদের দুরাবস্থা আরো বেড়ে যায়৷ অভাবের তাড়নায় ছোট মেয়েকে ঢাকা এক বাসায় বুয়ার কাজ দিয়ে এসেছে৷ বড়ো মেয়ে এস এসসি পাশ করেছে৷ তার একটি চাকুরীর জন্য এমপি মন্ত্রী ডিসি সাহেবদের কাছে অনেক ধর্না কোন লাভ হয়নি৷ তিনি জানান একটি পুত্র সন্তান থাকলে তাঁর এই বৃদ্দ বয়সে এই অবস্থা হতোনা৷ স্বামীর রেখে যাওয়া ৪ কাঠা ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ দুঃখ করে রিজিয়া খাতুন বললেন যুদ্ধে কোন মা বোনের ইজ্জত হানি ঘটেনি শুধু পুরুষদের অস্ত্রেই দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই সরকার মুক্তিযোদ্ধারের তালিকা করেছে৷ আর বীরাঙ্গনা খেতাবে ভুষিত করে সমাজে মাথা নেয়াবার সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছে আমাদের মত হতভাগা মেয়েদের৷ আর যেন কোন যুদ্ধে মা বোনদের বীরাঙ্গনা হতে না হয়৷ পুরুষের যাতাকলে বলির পাঁঠা মেয়েদের বীরাঙ্গনা খেতাব পাবার চেয়ে আত্মগোপন করাই ভাল ছিল বলে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন৷ স্বাধীনতার মত পরম বস্তুকে হাতে পেয়েও বীরত্বের খেতাবের চেয়ে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচার চেষ্টায় যারা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে ছিল তাদের অনেকেই ভাল আছেন৷ সে সব কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে রিজিয়া প্রতিশোধের আগুনে জ্বলে উঠে এখনও৷ এ কথা বলতে বলতে  চোখের জ্বলে বুক ভাসালেন রিজিয়া৷

রিজিয়াএখনও আশা করে সমাজে আট দশটা মানুষের মতো মাথা উচু করে থাকবেন৷ পেট ভরে তিন বেলা ভাত খাবেন৷ এটাকি কোন দিনও হবে না?

শেখ শফিউল আলম লুলু,
ঝিনাইদহ প্রতিনিধি৷

পাঠকের মন্তব্য

বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:

কীবোর্ড Bijoy      UniJoy      Phonetic      English
নাম: *
ই-মেইল: *
মন্তব্য: