আনিস হোসেন দুলাল দিনাজপুর থেকে:
৭ জন বৃদ্ধকে নিয়ে এ বছরের ২৫ এপ্রিল থেকে দিনাজপুরের রাজবাড়ীতে চালু হয়েছে বৃদ্ধদের আশ্রম৷ রাজবাটীস্থ শিশু পরিবারের একটি ভবনে চালু হওয়া এ নিবাসের নাম দেয়া হয়েছে শানত্মি নিবাস৷ দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম এটি উদ্বোধন করেন৷
দিনাজপুর জেলার অসহায় বৃদ্ধদের জন্য শানত্মি নিবাসের মূল পরিকল্পনায় ও বাস্তবায়নে রয়েছেন জেলা প্রশাসক মোঃ জামালউদ্দিন আহমেদ৷ দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম সহ আরও অনেকে বৃদ্ধশ্রমটিকে স্থায়ীরূপ দেওয়ার জন্য সক্রিয় রয়েছেন৷
শান্তি নিবাসে বর্তমানে ১০ জন বৃদ্ধ ছাড়াও ৪ জন বৃদ্ধা রয়েছেন৷ বৃদ্ধদের ছয় জনের বাড়ি দিনাজপুর সদর উপজেলার মধ্যে৷ একজনের বাড়ী কাহারোল এবং ২ জনের বাড়ী বিরল উপজেলার মধ্যে৷ দিনাজপুর বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেয়া বৃদ্ধদের বয়স সর্বনিম্ন ৬১ বছর থেকে ৮১ বছর পর্যন্ত৷
সবচেয়ে বেশী বয়সী বৃদ্ধ আব্বাস আলীর (৮১) বাড়ি দিনাজপুর সদরের ৪ নং শেখপুরা ইউনিয়নাধীন ভাটপাড়া-পারদীঘন গ্রামে৷ লেখাপড়া জানে না৷ তবে আরবীতে কোরান শরীফ পড়তে পারেন৷ তার স্ত্রী আমেনা খাতুন এখনো বেঁচে আছেন৷ তার রয়েছে ৩ ছেলে৷ সব ছেলেরাই নিজ নিজ সংসার নিয়ে ব্যস্ত৷ ছেলেদের সংস্কারে অভাব-অনটন লেগেই থাকে৷ পিতা-মাতাকে দেখার সামর্থ্য সে ভাবে তাদের নাই বলে আব্বাস আলী স্ত্রীকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতেন৷
বৃদ্ধ আব্বাসের এক নাতি রাজবাটী শিশু পরিবারে (এতিম খানা) থাকে৷ নাতির মাধ্যমেই তিনি বৃদ্ধদের আশ্রম চালু হচ্ছে বলে খবর পান৷ নাতির সাহায্যে নিজেই যোগাযোগ করেন এবং ভর্তি হন শান্তি নিবাসে৷
তার সাথে আলাপ হয় দিনাজপুর শহরের রাজবাটীস্থ বৃদ্ধা আশ্রমের শান্তি নিবাসে৷ তখন তিনি সকালের নাস্তা খাচ্ছিলেন৷ সবচেয়ে বয়সী বলে তার দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করেছিলাম,কেমন আছেন? এক ধরনের উচ্ছাস নিয়ে বললেন,এখানে এসে খুব ভাল আছি৷ কোন অসুবিধা হচ্ছে না৷ এখন সকালের নাস্তা ডিম রুটি খাচ্ছি৷ গতকাল মুরগীর গোস্ত দিয়ে ভাত খেয়েছি৷ বেশ আরামে আছি৷আরামে থাকার বিষয়টিতে সবাই একমত৷
রাজবাটী বড় মসজিদের পেছনের বাসিন্দা আইযুব আলী (৭৫),বাঁশেরহাট-কর্ণাই এলাকার যোগেন চন্দ্র রায় (৭০), একই এলাকার আরেক জন জিতেন্দ্রনাথ রায় (৬১), কাহারোলের গড়েয়া-দ্বিপনগরের আব্দুল আজিজ (৮০), দিনাজপুর সদরের শংকরপুর ইউনিয়নাধীন মোহনপুরের শুকুম আলী (৭৪), কমলপুরের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার (৭১) হলেন আব্বাস আলীর সাথী৷
শান্তি নিবাসের প্রথম অতিথি তারা৷ সকলেই তারা একমত যে, অভাব অনটনের কারণে আগে যেমন ছিলেন এখন তার চেয়ে অনেক ভাল আছেন৷
রাজবাড়ীর আইয়ুব আলী কর্ম জীবনে দিনাজপুর রেল স্টেশনের পিয়ন ছিলেন৷ তার দুই ছেলে রিক্সা চালায়৷ এখন তিনি বৃদ্ধ৷ ছেলেরা ঘুরে তাকাও না৷ দুই মেয়ের মধ্যে একজন বিধবা, আরেক জন পাগল৷ স্ত্রী বেঁচে আছেন ৷ কিন্তু খাদ্য-বস্ত্রের যোগান দিতে পারেন না এই বৃদ্ধ বয়সে৷ তাই নব প্রতিষ্ঠিত বৃদ্ধদের আশ্রম শান্তি নিবাসে এসে আশ্রয় নিয়েছেন৷
বাঁশের হাটের দুই বৃদ্ধ জগেন লোকের বাড়ীতে কামলা খাটতেন এবং জিতেন কৃষি কাজ করতেন৷ অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে জগেন নিজেই শানত্মি নিবাসে এলেও জিতেন এসেছেন সদর উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানের অনুরোধে৷ মোহনপুরের শুকুম আলী কৃষি কাজ করে সংসার চালাতেন৷ দূর্ঘটনায় তার হাত যখম হওয়ার পর তিনি অচল হয়ে পড়েন৷ কমলপুরের আবদুল সাত্তারও কৃষিজীবি ছিলেন৷ কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে কিছু করতে পারছেন না বলে আশ্রয় নিয়েছেন সোয়া দু মাস আগে চালু হওয়া শান্তি নিবাসে৷
এ প্রতিবেদনের শুরুতে যার নাম বলা হয়েছে সেই আব্বাস আলী ছয় মাস ধরে প্যারালাইসিসে ভুগছেন৷ বাম হাত ও পায়ে প্যারালাইজড৷ তবে অনেক চিকিত্সার পর এখন নিজে নিজে কিছুটা চলাফেরা করতে পারেন৷ তার সঙ্গে থাকা বৃদ্ধদের প্রায় সকলেই বার্ধক্য জনিত বিভিন্ন রোগের শিকার৷ তবে তাদের এখন আনন্দ যে,আগে পয়সার অভাবে ঔষধ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করতো এখন সেটা নেই৷ ঔষধ সহ যখন যা দরকার কেয়ার টেকারকে বললেই এনে দেয়৷ গায়ে মাখা ও কাপড় কাঁচা সাবান, তেল ঔষধ যখন যা দরকার চাইলেই পেয়ে যান দিনাজপুরের রাজবাটীতে নব প্রতিষ্ঠিত শান্তি নিবাসের বৃদ্ধরা৷
শান্তি নিবাসে আশ্রয় নেয়া একজন বৃদ্ধ জিতেন্দ্র নাথ রায় শিক্ষিত৷ তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস৷ তাই আশ্রমের নিত্যদিনের খরচের হিসাব রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তাকেই৷ তিনি বললেন, আশ্রমে এসে ভাল লাগছে৷ অন্য বৃদ্ধদের সাথে থেকে চমত্কার সময় কেটে যাচ্ছে৷
শান্তি নিবাসে বাবুর্চির দায়িত্বে আছেন রাজবাটীস্থ সুখসাগর পাড়ের বাসিন্দা আবু সালেক আবু(২৩)৷ বাবুর্চি হওয়ার আগে তিনি রিক্সা চালাতেন৷ তার আগে বিসিক শিল্পনগরীতে চাকুরী করতেন৷ তিন বেলা খাওয়া ও মাসে দু হাজার টাকা বেতনের বিনিময়ে বৃদ্ধদের সেবা করছেন৷ তিনি বললেন, এখানে বৃদ্ধরা ভাল আছেন৷ তারা আমার নানা-দাদার মত৷ তাদের সাথে থেকে আমিও বেশ ভাল আছি৷
বৃদ্ধরা মাঝে মাঝে বাড়ী যান৷ স্ত্রী, ছেলে-মেয়ে নাতি-নাতিদের সাথে দেখা করে আসেন৷ বৃদ্ধ আবুল আজিজ জানালেন, তাদের যাতায়াত খরচ আশ্রম থেকেই দেয়া হয়৷
শুধু বৃদ্ধ নয়, বৃদ্ধারাও বসবাস করছেন শান্তি নিবাসে৷ প্রায় ২০ বছর হলো স্বামী ক্ষিরোদ চন্দ্র মারা গেছেন ৬৩ বছর বয়সী ফুলমতি বেওয়ার৷ চিরিরবন্দর উপজেলার তালপুকুর গ্রাম নিবাসী ফুলমতির ১ ছেলে ৪ মেয়ে৷ মেয়েদের বিয়ে হয়েছে দরিদ্র ঘরে৷ তাদের পক্ষে মা’কে দেখা সম্ভব হয় না৷ এক মাত্র ছেলে বিয়ে করে মা’কে ফেলে রেখে ভারতে গেছে পাঁচ বছর আগে৷ চোখের পানি মুছতে মুছতে ফুলমতি বললেন, কত কান্দন কান্দেছো ,বেটা এ্যাংনা মোবিলও করে না৷ অভাব-অনটন খেয়ে না খেয়ে থাকা অবস্থার মধ্যে শান্তি নিবাসের সন্ধান পান ফুলমতি৷ ১২ জুলাই তিনি এখানে এসে আশ্রয় নেন৷
ফুলমতির মতই অনেকটা দুঃখ-কষ্টের জীবন চিরিরবন্দর উপজেলার ৫নং আব্দুলপুর ইউনিয়নের মৃত কফিল উদ্দিনর স্ত্রী শরিফা খাতুন (৫৮), দিনাজপুর সদর উপজেলার ৪নং শেখপুরা ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রাম নিবাসী মৃত গোপেশ চন্দ্র রায়ের স্ত্রী কিরণ বালা (৬০) এবং দিনাজপুর শহরের বালুয়াডাঙ্গা নিবাসী আজত আলীর স্ত্রী নূর নেহারের(৬৬)৷ তারা সকলেই স্বামী হারা৷ নূর নেহারের স্বামী মারা গেছে বছর ২ আগে৷ অন্যদের স্বামী ১৫ থেকে ২০ বছর আগে মারা গেছেন৷ স্বামীর মৃ্ত্যুর পর খাওয়া পরা নিয়ে তাদের দুঃখ -কষ্টের যে জীবন তা দূর হয়েছে শান্তি নিবাসে এসে৷ কিন্তু মনের দুঃখ তাদের রয়েই গেছে৷ নাতি-নাতনিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে ভাল লাগছেনা কারোই৷ তাই বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা একটু সুযোগ পেলেই ছুটি নিয়ে বাড়ী যাচ্ছেন৷ একদিন দুদিন থেকে আবার ফিরে আসছেন শান্তি নিবাসে৷ শান্তি নিবাস এখন তাদের স্থায়ী ঠিকানায় পরিণত হতে চলেছে৷
শান্তি নিবাসের মূল পরিকল্পনাকারী দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক মোঃ জামালউদ্দিন আহম্মেদ এই প্রতিনিধিকে জানালেন, শান্তি নিবাস যেন স্থায়ী ভাবে কার্যক্রম চালাতে পারে সে জন্য সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে৷ আর্থিক সংকট যেন না হয় সে জন্য একটি স্থায়ী ফান্ড করার প্রচেষ্টা চলছে৷
জেলা প্রশাসক জানান, স্থায়ী ফান্ডের জন্য ইতিমধ্যে জনতা ব্যাংক ১০ লক্ষ টাকা এবং নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ৪ লক্ষ টাকা দিয়েছেন৷ এছাড়াও ৩ জন বিত্তবান সমাজ কর্মী শান্তি নিবাসে বৃদ্ধদের সেবায় এগিয়ে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন৷ তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধাদের এই আশ্রমটি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে৷
দিনাজপুর সদর-৩ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম জানান, আপাতত এটা শিশু পরিবারের একটি ভবনে হলেও ভবিষ্যতে এই নিবাস নিজস্ব জায়গায় নিজস্ব ভবনে সরিয়ে নেয়া হবে৷ এজন্য জায়গা খোঁজা হচ্ছে৷




Posted on Oct 20, 2011
Holy Toledo, so glad I cielckd on this site first!