বঙ্গভবনে স্বাধীনতা সম্মাননা গ্রহন করল সোনিয়া

Print This Post Email This Post

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দেওয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্মাননা সোনিয়া গান্ধীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বিদেশিকে দেওয়া এটিই সর্বোচ্চ সম্মাননা। শাশুড়ির পক্ষে মরনোত্তর সম্মাননা গ্রহণ করে ভারতের কংগ্রেস দলের সভানেত্রী ও ক্ষমতাসীন ইউপিএ জোটের চেয়ারপারসন সোনিয়া গান্ধী বলেন, এ সম্মান শুধু ইন্দিরা গান্ধীকে নয়, প্রকৃতপক্ষে এর মাধ্যমে ভারত ও ভারতের মানুষকেই সম্মান জানানো হলো। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা বিদেশিদের মধ্যে ইন্দিরার ভূমিকা সবচেয়ে উজ্জল। তাই তাকে দিয়েই এ সম্মননা প্রদান প্রক্রিয়া শুরু করলো সরকার, জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সোমবার সন্ধ্যা ছয়টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে ইন্দিরাকে দেওয়া মরনোত্তর সম্মাননা সোনিয়া গান্ধীর হাতে তুলে দেন। এর আগে ইন্দিরাকে দেওয়া মানপত্রের বাংলা সংস্করণ পাঠ করে শোনান মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম আবদুল আজিজ। ২৪ ঘণ্টার সফরে গত রোববার রাত পৌনে নয়টায় ঢাকা আসেন সোনিয়া গান্ধী। শাশুড়ির পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করে সোনিয়া গান্ধী তার অনুভূতির কথা জানিয়ে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, ইন্দিরা গান্ধী যদি আজকে আমাদের মধ্যে থাকতেন তবে এই অসামান্য সম্মানে তিনি নিশ্চয়ই পুলকিত হতেন। এই সম্মাননা অবতর্মানে থাকা মানুষকে আমাদের মাঝে এনে দিয়েছে। ঢাকা সফরে আসতে পেরে নিজের ভাললাগা ও আবেগের কথা জানান সোনিয়া। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সফর আমার কাছে শুধু অন্য একটি দেশ সফরে যাওয়া নয়। এটা অন্য ধরনের একটি অনুভূতির বিষয়। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকালে নয়াদিল্লিতে যাত্রাবিরতির সময় সেদিন বিমানবন্দরে স্বামী রাজিব গান্ধীর সঙ্গে উপস্থিত থাকার কথাও স্মরণ করেন সোনিয়া। বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী দীর্ঘজীবি হোক বলে বক্তব্য শেষ করেন তিনি। এর আগে সোমবার বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে বঙ্গভবনে আসেন প্রধানমন্ত্রী। এর কিছুক্ষণের মধ্যে সোনিয়া দরবার হল প্রাঙ্গণে আসেন। এ সময় সোনিয়াকে রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনের দরবার হলের বাইরের দেয়াল ও বিভিন্ন স্থানে থাকা ছবি ও স্মারক ঘুরে দেখান। সাড়ে পাঁচটায় সোনিয়া গান্ধীকে সঙ্গে নিয়ে দরবার হলে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। তারা মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন। উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে তাদের সম্মান জানান। অভ্যাগত অতিথিরা বেলা চারটা থেকেই বঙ্গভবনের দরবার হলে আসন গ্রহণ করেন। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্যসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ছিলেন। এছাড়া অটিজম সম্মেলনে আসা বিদেশি অতিথিরাও এসেছিলেন বঙ্গভবনে। সবমিলিয়ে প্রায় হাজার খানেক অভ্যাগত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন বলে বঙ্গভবন সংশ্লিষ্টরা জানান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং মন্ত্রিসভা বিভাগ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় প্রথমে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, পরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, সোনিয়া গান্ধী ও রাষ্ট্রপতি বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ইন্দিরার অনবদ্য অবদানের কথা সবাই তাদের বক্তৃতায় উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সোনিয়া গান্ধীর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মাননা স্মারক ও মানপত্র তুলে দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যে বলেন, মুক্তিযুদ্ধকালীন ইন্দিরা গান্ধী শুধু আমাদের সহায়তাই করেননি, আমাদের মানসিকভাবেও চাঙ্গা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে ইন্দিরা গান্ধী শুধু বিশ্বজনমত গড়ে তুলেই ক্ষান্ত হননি, পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য তিনি বিশ্ব সফর করেছিলেন। শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী দ্রুত সময়ের মধ্যে ফিরিয়ে নেওয়াও ছিল তৎকালীন বিশ্বের একটি অনন্য নজির।’ তিনি বলেন,ইন্দিরা গান্ধী ওই দুঃসময়ে পাশে ছিলেন বলেই আমরা আমাদের বিজয় অর্জন করতে  পেরেছিলাম। ইন্দিরার ভূমিকা আমাদের কোনও দিনই ভুলবার নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবেও গান্ধী পরিবারের কাছে ঋণী, বলেন হাসিনা। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর আমাকে ও আমার বোনকে ইন্দিরা গান্ধীই ভারতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যের সুসম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও বৃদ্ধি পাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা। সোনিয়া গান্ধী ও তার পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘায়ু কামনা করেন শেখ হাসিনা। এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) তাজুল ইসলাম। এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি বক্তব্য রাখেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে বিদেশীদের সম্মাননা জানানো স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। মানপত্র ও সম্মাননা স্মারক: মানপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘শুরু থেকেই নানা প্রতিকূলতার পরও বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের পাশে ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন। প্রতিনিয়ত কূটনৈতিকভাবে নানা সমস্যার মোকাবিলা করে এ দেশের মানুষের মুক্তিসংগ্রামে দৃঢ়তার সঙ্গে সাহস জুগিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত করেছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে তার অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।’ মুক্তিযুদ্ধে অবদানরাখা বিদেশিদের জন্য এই সর্বোচ্চ সম্মাননার পদক হিসেবে দেওয়া হয় ১৮ ক্যারেটের ২০০ ভরি ওজনের স্বর্ণ দিয়ে তৈরি স্মারক। স্বর্ণ কেনা হয়েছে ঢাকার একটি প্রসিদ্ধ জুলেয়ার্স থেকে। সৌহার্দ্য, শান্তি ও অর্জনের প্রতীক হিসেবে কদমগাছের নকশা আঁকা ষোড়শ শতাব্দীর টেরাকোটার আদলে তেরি পদকের নকশা করেছেন শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী ও শিল্পী হাশেম খান। সেগুন কাঠের ফ্রেমে ভাঁজ করা বক্সের মধ্যে দুই পাশে দুটি কাঠের প্লেট রয়েছে। অর্ধ শতাব্দী পুরনো গাছের গুড়ি থেকে এ কাঠ সংগ্রহ করা হয়। প্লেট দুটি  দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ৮ দশমিক ২৫ ও ৮ দশমিক ৫ ইঞ্চি। পদকের বাঁ পাশের প্লেটটিতে বাংলা ও ইংরেজিতে স্বর্ণের ওপর খোদাই করে লেখা রয়েছে ‘শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্ট্রনায়ক, ভারত প্রজাতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রীকে (২৪ জানুয়ারি ১৯৬৬ হতে ২৪ মার্চ ১৯৭৭; ১৪ জানুয়ারি ১৯৮০ হতে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অনন্যসাধারণ অবদানের জন্য বাঙালি জাতির শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সর্বোচ্চ নিদর্শনস্বরূপ ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা সম্মাননা’ স্মারক প্রদান করা হলো। ১০ শ্রাবণ ১৪১৮, ২৫ জুলাই ২০১১ খ্রি. গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বঙ্গভবনে প্রদত্ত।’ নিচে বাঁ পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ডান পাশে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের খোদাই করা স্বাক্ষর রয়েছে। পদকের ডান পাশের প্লেটে রয়েছে এ অঞ্চলের ষোড়শ শতাব্দীর টেরাকোটা নকশার আদলে কদমগাছের প্রতীক। এ প্রতীকের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্ক অসাম্প্রদায়িক ও গণতন্ত্রকামী মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে বোঝানো হয়েছে।

পাঠকের মন্তব্য
  1. Gertie
    Posted on Oct 21, 2011

    You put the lime in the ccoonut and drink the article up.

বাংলা (ইউনিকোডে) অথবা ইংরেজীতে আপনার মন্তব্য লিখুন:

কীবোর্ড Bijoy      UniJoy      Phonetic      English
নাম: *
ই-মেইল: *
মন্তব্য: